স্টাফ রিপোর্টার: সাভারে ওএমএস ডিলারের অনিয়ম অনুসন্ধানে যাওয়া ৪ সাংবাদিকের ওপর সন্ত্রাসী হামলা ও মিথ্যা মামলায় কারাগারে প্রেরণের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকবৃন্দ।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডস্থ বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদের মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা। তারা হলেন- দৈনিক বিজনেস ফাইল পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি এফ রহমান রূপক, দৈনিক মুক্ত খবর পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার মো. আবু বকর সিদ্দিক, দৈনিক মুক্ত খবর পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার মনজুরুল হক মঞ্জু ও দৈনিক একুশে সংবাদের স্টাফ রিপোর্টার মো. পিন্টু শেখ।
লিখিত বক্তব্যে তারা বলেন, একটি তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সকালে সাভার থানার চাপাইন মেম্বারের মোড় এলাকায় ডিলার জাহাঙ্গীরের ওএমএস দোকানে সরেজমিনে গিয়ে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়।
ওএমএস বিক্রির নিয়ম অনুযায়ী-
১. সকাল ৯টায় উপজেলা খাদ্য তদারককারী কর্মকর্তা খাতায় সই দিয়ে সেল চালু করবেন। তিনি দোকান চালু না করা পর্যন্ত কোনো পণ্য বিক্রি করা যাবে না।
২. প্রতিদিন ১০০ জনের মাঝে ৫ কেজি চাল ও ৫ কেজি আটা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিক্রি করতে হবে।
৩. লাইনে যে দাঁড়াবে সেই পণ্য কিনতে পারবে, এটি ওপেন মার্কেট সেল।
৪. পণ্য ক্রয়ের সময় ভোক্তার কাছ থেকে কোনো প্রকার এনআইডি কার্ড জমা নেওয়া যাবে না।
৫. এক টন চাল ও এক টন আটা বিক্রির পর উদ্বৃত্ত থাকলে ব্যালেন্স শিটে দেখাতে হবে।
কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১০টায় ৩৩ বস্তা চালের মধ্যে মাত্র ৫ বস্তা চাল রয়েছে। বাকি ২৮ বস্তা ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়। মাত্র আধা ঘণ্টায় ২৮ বস্তা বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ডিলারের লোকজন চুপ হয়ে যান। তারা স্বীকার করেন, তদারককারী কর্মকর্তা ফোনে ফোনে দোকান চালু করেন, পরে এসে খাতায় সই করেন।
এ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোক্তারা অভিযোগ করেন, তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মাল পান না। দুপুর ১২টা বাজলেই বলা হয় আজ আর দেওয়া হবে না। এনআইডি কার্ডে তারিখ লিখে ১৫ দিন পর আসতে বলা হয়, ১৫ দিন পর এসেও মাল মেলে না।
বিষয়টি ঢাকা জেলা খাদ্য কর্মকর্তাকে জানানো হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তাকে জানাতে বলেন। উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে আসছেন বলে জানান।
এ সময় ডিলারের লোক পরিচয়ে এক যুবক এসে সাংবাদিকদের পরিচয় ও ভিজিটিং কার্ড নেন এবং হুমকি দিয়ে বলেন, “একটু পরেই সব জানতে পারবেন।” একের পর এক ফোন দিতে থাকেন তিনি। সন্দেহ হলে সাভার থানার ওসি সাইফুলকে বিষয়টি জানানো হয়।
কিছুক্ষণ পর ৫-৭ জন যুবক এসে কোনো কথা ছাড়াই সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাদের একজন নিজেকে সাভার প্রেস ক্লাবের নেতা বলে দাবি করেন। হামলা চলাকালীন উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে সাংবাদিকদের রক্ষার নামে হামলাকারীদের হাতে তুলে দিয়ে কৌশলে চলে যান।
পরে সাভার থানার এসআই আব্বাস পুলিশ টিম নিয়ে এসে নিরাপত্তার কথা বলে সাংবাদিকদের থানায় নিয়ে যান। থানায় ওসি না থাকায় তিনি তাদের সার্কেল এসপি (ট্রাফিক) এর কাছে নিয়ে যান। সেখানে ডিলার জাহাঙ্গীর অভিযোগ করেন, সাংবাদিকরা ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় দিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন এবং ৩০ জন সাধারণ মানুষ তার সাক্ষী। প্রমাণ দেখাতে বললে পুলিশ কোনো কথা শুনতে চায়নি।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, “আমাদের কাছে ডিলারের কালোবাজারি ও অনিয়মের ভিডিও ডকুমেন্টস আছে। পুলিশ তা দেখতে রাজি হয়নি। উল্টো ডিলারের সাজানো অভিযোগে মামলা দিয়ে আমাদের জেল হাজতে পাঠানো হয়।
এদিকে সাভার উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি নাজমুল সহ বিভিন্ন হাউজের সাংবাদিকরা ভুক্তভোগীদের বক্তব্য না নিয়ে একপেশে খবর প্রকাশ করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
উল্লেখ্য, ভুক্তভোগী ৪ সাংবাদিক কারাবরণ শেষে বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন।
*সংবাদ সম্মেলনে ৪ দফা দাবি তুলে ধরা হয়:*
১. সাভারের ডিলার জাহাঙ্গীর ও তদারককারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওএমএস পণ্য কালোবাজারি ও অনিয়মের ভিডিও ফুটেজসহ সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে।
২. দায়িত্বরত ৪ সাংবাদিকের ওপর হামলাকারী সন্ত্রাসী ও ইন্ধনদাতাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে।
৩. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা ও বানোয়াট চাঁদাবাজির মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৪. দায়িত্বে অবহেলাকারী উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে হুঁশিয়ারি দিয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা বলেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা না নিলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন শেষে খাদ্য অধিদপ্তর ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সামনে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক নতুন স্বপ্ন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং জাতীয় মডেল প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি সাইদ আজিজ চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা শাহজাহান মিয়া, জাতীয় ক্রাইম রিপোর্টার্স সোসাইটির সাংগঠনিক সম্পাদক কিশোর ডি কস্তা, সিনিয়র সাংবাদিক শাহ আলম, সিনিয়র সাংবাদিক আবুল বাশার প্রমুখ।
মন্তব্য করুন