news editor
১৪ জুন ২০২৬, ১:০৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

একবেলা খাবার আর ৫০ টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে যাওয়া মুসার শৈশব

রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতাঃ বয়স মাত্র ৯ বছর। এই বয়সে যেখানে সমবয়সী আর দশটা শিশুর মতো হাতে থাকার কথা রঙিন মলাটের পাঠ্যবই, কলম কিংবা প্রিয় কোনো খেলনা। সেখানে ৯ বছরের শিশু মুসার হাতে শোভা পাচ্ছে ময়লা-কালি মাখা কাপড়ের টুকরো, পানির বালতি আর ভারী সব যন্ত্রাংশ।ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মাহানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর চটপটে শিক্ষার্থী ছিল মুসা। রোল নম্বর ধরে শিক্ষকের ডাকার জবাবে ‘উপস্থিত স্যার’ বলার সেই চিরচেনা দিনগুলো এখন তার অতীত। বছর খানেক আগে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে থমকে গেছে তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা। বই-খাতা তুলে রেখে জীবনযুদ্ধের কঠিন ময়দানে নেমে পড়তে হয়েছে এই অবুঝ শিশুকে।
খোজ নিয়ে জানা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পঁচিশ মাইল এলাকার মাহানপুর গ্রামে পরিবারের সঙ্গেই ছিল মুসার বসবাস। তবে তার জীবনের গল্পটা আর পাঁচটা সাধারণ শিশুর মতো সহজ কিংবা আনন্দময় নয়। মুসার পিতা বাবু একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষ, যিনি নিজেই নিজের ভরণপোষণ বা সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম। অন্যদিকে, এক বছর আগে এক চরম বাস্তবতার মুখে মুসাকে ফেলে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান মা জিন্নাত বেগম। মায়ের মমতা আর বাবার আশ্রয়, দুই-ই হারিয়ে এক প্রকার অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে ছোট্ট মুসা।
​মায়ের চলে যাওয়া এবং বাবার অক্ষমতার পর মুসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার বৃদ্ধ দাদি তমিজা খাতুন। পরম স্নেহে কিছুদিন লালন-পালন করলেও বার্ধক্যের নিষ্ঠুরতার কাছে হার মানতে হয় তাকেও। নিজের শরীর যখন আর চলে না, তখন নাতিকে আগলে রাখার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেন তমিজা খাতুন। তীব্র অসহায়ত্ব যখন পুরো পরিবারকে গ্রাস করছিল, ঠিক তখনই এগিয়ে আসেন মুসার ফুফু খাদিজা বেগম। মুসাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন নিজের বাড়িতে।
মুসার ফুফু খাদিজা বেগমের নিজের সংসারের টানাপোড়েনের গল্প তুলে ধরে জানান, অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে কোনো রকমে দিন চলে তার। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সেই সংসারে আরো একটি মুখের অন্ন জোগান দেওয়া খাদিজার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষুধার তীব্র জ্বালা আর সংসারের চরম অভাবের মুখে বাধ্য হয়েই ফুফু খাদিজা বেগম এক বুক কষ্ট চেপে মুসাকে কাজে পাঠিয়ে দেন। মুসার কর্মস্থল নির্ধারণ হয় ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইন এলাকার ‘মহেনের গ্যারেজ’।
মহেনের গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, ৯ বছরের এই কোমলমতি শিশুটি এখন সেই গ্যারেজের একজন পুরোদস্তুর শ্রমিক। গ্যারেজে মুসার দৈনিক রুটিন এক প্রকার বাঁধাধরা। সকাল হতেই শুরু হয় তার হাড়ভাঙা খাটুনি। দূর থেকে পানি টেনে আনা, কাদা-মাটি মাখা নোংরা গাড়ি পানি দিয়ে ধোয়া থেকে শুরু করে গ্যারেজের মালিক ও মেকানিকদের সব রকমের টুকিটাকি ফরমায়েশ খাটা। এই সবই করতে হয় এইটুকু শিশুকে।
গ্যারেজ মালিক মহেন বাবু বলেন, একদিন মুসার ফুফুর পরিবার মুসাকে নিয়ে আসে। ছোটো শিশু হওয়ায় আমি তাকে কাজে রাখতে চাইনি। তবে ওর পারিবারিক বাস্তবতা জানার পর বেশ মায়া হয়। কোনো কাজ না পেলে শিশুটির খাবার জুটবেনা। তাই উপায়ন্তর কাজে রাখতে রাজি হই।
কথা হয় শিশু মুসার সঙ্গে। মুসা জানায়, সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে মহেনের গ্যারেজ থেকে মুসা পায় মাত্র একবেলা দুপুরের খাবার আর দৈনিক ৫০টি টাকা।
সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সন্ধ্যায় যখন শরীর আর চলতে চায় না, তখন গ্যারেজ থেকে পাওয়া সেই ৫০ টাকার নোটটি মুসা সযত্নে নিয়ে ফেরে ফুফুর বাড়িতে। প্রতিদিনের উপার্জিত টাকাটা সে ফুফু খাদিজার হাতে তুলে দেয়। বিনিময়ে ফুফুর বাড়িতে জোটে রাতে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই, রাতের খাবার আর পরের দিন সকালের যৎসামান্য আহার। নিজের দুবেলা দুমুঠো খাবারের জোগান দিতে এভাবেই প্রতিদিন নিজের শৈশবকে বিক্রি করে দিচ্ছে মুসা।
মুসার সঙ্গে কথা বলার সময় তার নিষ্পাপ চোখের কোণে দেখা মেলে এক অদ্ভুত শূন্যতা। যে বয়সে মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে কানামাছি কিংবা ফুটবল খেলার কথা, সেই বয়সে সে বোঝে কেবল বেঁচে থাকার লড়াই। পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করতেই মাথা নিচু করে নেয় সে। হয়তো মনের গভীরে এখনো স্কুলের সেই বারান্দা, বন্ধুদের কোলাহল আর শিক্ষকের আদর তাকে টানে, কিন্তু গ্যারেজের কালচে মবিল আর পোড়া তেলের গন্ধ সেই স্বপ্নকে আড়াল করে দেয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলামের মতে, বর্তমান বাজারে ৫০ টাকার মূল্য কতটুকুই বা? কিন্তু এই ৯ বছরের শিশুর কাছে এটাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। মুসার মতো হাজারো শিশু প্রতিবছর পারিবারিক ভাঙন এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে অকালে ঝরে পড়ছে। শিশুশ্রম আইনত দণ্ডনীয় হলেও পেটের ক্ষিধের কাছে এই আইন যেন কেবলই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। শুধু ঠাকুরগাঁও জেলাতেই গ্যারেজ, হোটেল, কামারের দোকান সহ বিভিন্ন স্থানে কাজ করছে মুসার মতো শত শত শিশু শ্রমিক।
সচেতন মহলের মতে, নয় বছরের মুসার এই লড়াই কেবল তার একার নয়; এটি আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এবং খসে পড়া পারিবারিক কাঠামোর এক নির্মম প্রতিফলন। একবেলা খাবার আর ৫০ টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে যাচ্ছে একটি সম্ভাবনা, একটি ভবিষ্যৎ। গ্যারেজের কালচে ময়লার আস্তরণেই হয়তো ঢাকা পড়ে যাবে মুসার সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ার কৃতিসন্তান আব্দুল্লাহ আল ফারুক ২৫তম বিসিএস (পুলিশ) ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত

১

ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের নতুন ডিসি আক্তার হোসেন

২

জাল টিপসই দিয়ে খাদ্যবান্ধবের ৪০০ বস্তা চাল আত্মসাতের চেষ্টা, ডিলার আটক

৩

তালাশ টিমের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদের বিরুদ্ধে ক্যান্সার গবেষক অধ্যক্ষ ডা. এস এম সরওয়ারের সংবাদ সম্মেলন ও তীব্র প্রতিবাদ

৪

বগুড়ায় সমবায় সমিতির মালিকের বিরুদ্ধে ১২ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির লিগ্যাল নোটিশ

৫

এখনো আমি উঠে দাঁড়াই —মায়া এঞ্জুলো, অনুবাদ : আমি

৬

দিনাজপুরে OMS চাল-আটা বিক্রিতে ব্যাপক অনিয়ম: তদারককিহীন ডিলারদের স্বেচ্ছাচারিতা, নীরব কর্তৃপক্ষ ‎

৭

ঠাকুরগাঁওয়ে OMS ডিলার নিয়োগে অনিয়ম: চাল-আটা নিয়ে চরম ভোগান্তি ও ক্ষোভ

৮

‘মিলেমিশে খাওয়া’ হলো না, বরখাস্ত ৩ খাদ্য কর্মকর্তা

৯

ভাঙ্গুড়ায় নকল দুধ তৈরির কারখানায় অভিযান, এক ব্যক্তির কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড

১০

পাঁচবিবিতে উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

১১

ঠাকুরগাঁওয়ে অসহায় কৃষক পরিবারের ফসলের পরিচর্যা ও সংগ্রহে এগিয়ে এলো আনসার-ভিডিপি

১২

মুন্সিগঞ্জে ওএমএস চাল-আটা নিয়ে অনিয়ম, ডিলার,আটা মিলার ও খাদ্য কর্তৃপক্ষের যোগসাজোসে কালোবাজারি সিন্ডিকেট, হেনস্তার শিকার অনুসন্ধানী টিম 

১৩

মুগদা বড় মসজিদ সংলগ্ন উচ্ছেদকৃত স্থানে দোকান নির্মাণ

১৪

“পেশার আগে মানুষ: সাংবাদিক, পুলিশ ও শিক্ষকও হাসতে চান, বাঁচতে চান”

১৫

পরিবেশ সুরক্ষা ও সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে অংশীদার হলো শিবগঞ্জ উপজেলা (বগুড়া) কল্যাণ সমিতি, ঢাকা।

১৬

টেকসই উন্নয়নে দক্ষ ব্যবস্থাপক অপরিহার্য: অতিথি গ্রুপের ম্যানেজার কর্মশালায় লায়ন সাইফুল ইসলাম সোহেল

১৭

পাবনায় ওএমএসের চাল-আটা কালোবাজারির অভিযোগে নারী ডিলারের বিরুদ্ধে এজাহার

১৮

রেশনিং ওএমএস চাল-আটা কালোবাজারে বিক্রিতে ডিলারদের বাধ্য করছেন অসাধু কর্মকর্তারা!

১৯

সাইবার সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন তরুণ উদ্যোক্তা নাজমুল হক সজীব

২০