news editor
১০ জুন ২০২৬, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

দেশ দেখার নেশায় ঘর ছেড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের মোবাশ্বের, সঙ্গী দুই চাকার বাহন

রহমত আরিফ ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতাঃ প্রচণ্ড তাপদাহে পুরো শরীর ঘেমে একাকার। তৃষ্ণায় শুকিয়ে গেছে মুখ। মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য, দীর্ঘ পথের ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তা সবকিছুকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলছেন এক তরুণ। কাঁধে একটি ব্যাগ, মাথায় নিরাপত্তা হেলমেট, সঙ্গে একটি সাইকেল, বাংলাদেশের পতাকা আর বুকভরা স্বপ্ন। দুই চাকার বাহনে ভর করে তিনি ছুটে চলেছেন এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায়। তার নাম মোবাশ্বের আলী।
দেশকে জানার, মানুষের গল্প শোনার এবং বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখার অদম্য ইচ্ছা থেকেই শুরু হয়েছে মোবাশ্বের আলীর এই ব্যতিক্রমী যাত্রা। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল নিজের জন্মভিটা রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় রাজারামপুর গ্রাম থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। লক্ষ্য ধীরে ধীরে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে দেখা। যাত্রার শুরুতে তিনি পঞ্চগড় জেলার পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করেন। এরপর পা রাখেন ঠাকুরগাঁওয়ে। বর্তমানে তার ভ্রমণের ৩৯তম দিন চলছে। এরই মধ্যে তিনি দুই জেলার ৮টি উপজেলায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে নতুন নতুন গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন এই তরুণ অভিযাত্রী।

মোবাশ্বের আলী রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় রাজারামপুর গ্রামের কৃষক রুহুল আমিন ও মর্জিনা বেগম দম্পতির ছোট ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র।

সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও তার স্বপ্ন মোটেও সাধারণ নয়। ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণের প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহই একসময় রূপ নেয় বড় স্বপ্নে। আর সেই স্বপ্নের পথ ধরেই এখন সাইকেলে ঘুরে দেখছেন নিজের দেশকে। তবে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য আরও বড় একদিন সাইকেলে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়া।

প্রচণ্ড রোদ, ঝড়-বৃষ্টি, ক্লান্তি কিংবা দীর্ঘ পথ কোনো বাধাই থামাতে পারেনি তাকে। সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে স্বপ্নের পিছে ছুটে চলা এই তরুণ যেন প্রমাণ করে চলেছেন- ইচ্ছাশক্তি আর সাহস থাকলে সীমিত সামর্থ্যও বড় কোনো স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম, রাজ্জাক, রুবেল ও আরিফ বলেন, ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগছে। এখনকার সময়ে অনেক তরুণই মোবাইল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু মোবাশ্বের দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ঘুরে মানুষ ও প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করছে। এত অল্প বয়সে এমন চিন্তা-ভাবনা আর সাহস সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তার স্বপ্ন আর লক্ষ্য সম্পর্কে শুনে আমরা মুগ্ধ হয়েছি।

তারা আরও বলেন, সে শুধু নিজের শখ পূরণের জন্য ঘুরছে না, পাশাপাশি মানুষকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতন করারও চেষ্টা করছে। গাছ লাগানো, প্রকৃতি সংরক্ষণ করা এবং পরিবেশ বাঁচানোর যে বার্তা সে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পথ চলতে তার মতো তরুণদের আরও সহযোগিতা করা উচিত। আমরা মনে করি, দেশের তরুণ সমাজ যদি তার মতো ইতিবাচক চিন্তা ও উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে সমাজ ও দেশের অনেক উপকার হবে। আমরা তার এই যাত্রার সফলতা কামনা করি এবং আশা করি সে নিরাপদে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।

মোবাশ্বের আলী বলেন, ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে খুব ধীরে ও কাছ থেকে দেখার। বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত চলেছি শুধুমাত্র বাংলাদেশকে খুব কাছ থেকে দেখার লক্ষ্যে। আমি আমার এই যাত্রা শুরু করেছি রংপুরে পীরগঞ্জ থেকে গত ৩০ এপ্রিল। শুধু যে সাইকেল যাত্রা করছি এমন নয়, শিক্ষার্থী ও দেশের মানুষের কাছে আমার একটা বার্তা আছে। সেটা হলো প্রকৃতি বাঁচলে আমরা বাঁচবো। দেশের শিক্ষার্থী দেশের জনসাধারণ সবার মধ্যে একটা গণজাগরণ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যাতে সবাই গাছ লাগায় এবং পরিবেশ বাঁচায়।

তিনি জানান, এই দীর্ঘ ভ্রমণের ব্যয় নির্বাহ করছেন মূলত নিজের টিউশনি করে জমানো টাকা দিয়ে। পাশাপাশি পরিবারও সহযোগিতা করছে। তবে পথে বের হওয়ার পর দেশের নানা প্রান্তের মানুষের আন্তরিকতা ও ভালোবাসাও তাকে মুগ্ধ করেছে। অনেকেই তাকে খাবারের দাওয়াত দেন, কেউ বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়ান। সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসাই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।

ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন বলেন, মোবাশ্বের আলীর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। একজন তরুণ শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি সাইকেলে দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে জানার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ ও গাছ লাগানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, তবে দীর্ঘ পথ ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তাকে সড়ক আইন মেনে চলা, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা এবং যাত্রাপথে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছি। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সফল হোক এবং তিনি নিরাপদে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বগুড়ার কৃতিসন্তান আব্দুল্লাহ আল ফারুক ২৫তম বিসিএস (পুলিশ) ফোরামের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত

১

ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের নতুন ডিসি আক্তার হোসেন

২

জাল টিপসই দিয়ে খাদ্যবান্ধবের ৪০০ বস্তা চাল আত্মসাতের চেষ্টা, ডিলার আটক

৩

তালাশ টিমের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদের বিরুদ্ধে ক্যান্সার গবেষক অধ্যক্ষ ডা. এস এম সরওয়ারের সংবাদ সম্মেলন ও তীব্র প্রতিবাদ

৪

বগুড়ায় সমবায় সমিতির মালিকের বিরুদ্ধে ১২ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির লিগ্যাল নোটিশ

৫

এখনো আমি উঠে দাঁড়াই —মায়া এঞ্জুলো, অনুবাদ : আমি

৬

দিনাজপুরে OMS চাল-আটা বিক্রিতে ব্যাপক অনিয়ম: তদারককিহীন ডিলারদের স্বেচ্ছাচারিতা, নীরব কর্তৃপক্ষ ‎

৭

ঠাকুরগাঁওয়ে OMS ডিলার নিয়োগে অনিয়ম: চাল-আটা নিয়ে চরম ভোগান্তি ও ক্ষোভ

৮

‘মিলেমিশে খাওয়া’ হলো না, বরখাস্ত ৩ খাদ্য কর্মকর্তা

৯

ভাঙ্গুড়ায় নকল দুধ তৈরির কারখানায় অভিযান, এক ব্যক্তির কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড

১০

পাঁচবিবিতে উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

১১

ঠাকুরগাঁওয়ে অসহায় কৃষক পরিবারের ফসলের পরিচর্যা ও সংগ্রহে এগিয়ে এলো আনসার-ভিডিপি

১২

মুন্সিগঞ্জে ওএমএস চাল-আটা নিয়ে অনিয়ম, ডিলার,আটা মিলার ও খাদ্য কর্তৃপক্ষের যোগসাজোসে কালোবাজারি সিন্ডিকেট, হেনস্তার শিকার অনুসন্ধানী টিম 

১৩

মুগদা বড় মসজিদ সংলগ্ন উচ্ছেদকৃত স্থানে দোকান নির্মাণ

১৪

“পেশার আগে মানুষ: সাংবাদিক, পুলিশ ও শিক্ষকও হাসতে চান, বাঁচতে চান”

১৫

পরিবেশ সুরক্ষা ও সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে অংশীদার হলো শিবগঞ্জ উপজেলা (বগুড়া) কল্যাণ সমিতি, ঢাকা।

১৬

টেকসই উন্নয়নে দক্ষ ব্যবস্থাপক অপরিহার্য: অতিথি গ্রুপের ম্যানেজার কর্মশালায় লায়ন সাইফুল ইসলাম সোহেল

১৭

পাবনায় ওএমএসের চাল-আটা কালোবাজারির অভিযোগে নারী ডিলারের বিরুদ্ধে এজাহার

১৮

রেশনিং ওএমএস চাল-আটা কালোবাজারে বিক্রিতে ডিলারদের বাধ্য করছেন অসাধু কর্মকর্তারা!

১৯

সাইবার সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন তরুণ উদ্যোক্তা নাজমুল হক সজীব

২০