সুজন মাহমুদ : নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার খাকসা গ্রামে একটি পারিবারিক আর্থিক বিরোধ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিয়ে মারধর, বিশৃঙ্খলা এবং শেষ পর্যন্ত পুলিশি হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার ঘটনা ঘটেছে। রোববার বিকেলে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিনের সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খাকসা গ্রামের বাসিন্দা মহিদুল উদ্দিন মফিজের সঙ্গে তার ভাই ও ভাতিজাদের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছিল। একই সঙ্গে তার ভাইগ্নার সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়েও পারিবারিক টানাপোড়েন ছিল। বিষয়টি নিয়ে কয়েক দফা কথাকাটাকাটি ও পারিবারিক মীমাংসার চেষ্টা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ঘটনার দিন বিকেলে পারিবারিক বিরোধের জেরে মফিজের সঙ্গে তার ভাতিজা সাকিল হোসেনের বাকবিতণ্ডা হয়, যা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মফিজ তার ভাইগ্না রুবেলের সঙ্গে দেখা করতে পাশের চৌমহোন গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তবে সেখান থেকে ফেরার পথে বাগডোব ঈদগাহ মাঠ এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঈদগাহ মাঠ এলাকায় ভরতপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেন আনু, কে উদ্দেশ্য করে মফিজ বলেন, পারিবারিক বিষয়ে বাইরে কাউকে জড়ানো উচিত নয় এবং সমাধানে হস্তক্ষেপ না করার অনুরোধ জানান। তবে উপস্থিত কিছু ব্যক্তি বিষয়টিকে সতর্কবার্তা নয়, বরং হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এতে করে ঘটনাস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয়দের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়।
পরে মফিজ রুবেলের বাড়ি থেকে ফেরার পথে পুনরায় ঈদগাহ মাঠে উপস্থিত জনতার মুখোমুখি হন। এ সময় উত্তেজিত কয়েকজন ব্যক্তি তাকে মারধর করে বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে আশপাশের কিছু দোকানদার ও স্থানীয় ব্যক্তি তাকে একটি দোকানের ভেতরে নিয়ে যান এবং পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। এ সময় সামাজিক সংগঠন ‘তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশ চাই’-এর আহ্বায়ক মো. মেহেদী হাসান নোমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তার উদ্যোগে এবং স্থানীয় কিছু সচেতন নাগরিকের সহায়তায় মফিজকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।
তবে পরিস্থিতি তখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের উপস্থিতিতেই কিছু উত্তেজিত ব্যক্তি আবারও মফিজকে আঘাত করার চেষ্টা করে। এতে ঘটনাস্থলে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ মফিজকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন, আবার অন্য একটি পক্ষ তাকে ‘ভালো মানুষ ও সম্মানীয় ব্যক্তি’ বলে দাবি করেন। জনতার এমন বিভক্ত অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারাও চাপে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইন্সপেক্টর মো. রাশেদসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ধাক্কাধাক্কি ও আঘাতের শিকার হন। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে পুলিশ দ্রুত মফিজকে একটি গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি মূলত পারিবারিক বিরোধ থেকে শুরু হলেও স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের বিষয়টি সামনে চলে আসায় উত্তেজনা বেড়ে যায়। কিছু ব্যক্তি বিষয়টিকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট থানা কর্তৃপক্ষ।
এদিকে স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা সম্পত্তি ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের সমাধান না হওয়ায় বিরোধ চরমে ওঠে। সামাজিক ও পারিবারিক সালিশি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেকে মনে করছেন, শুরুতেই যথাযথ মধ্যস্থতা হলে এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল।
ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া কিংবা জনসমক্ষে সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রামবাংলায় পারিবারিক বিরোধ অনেক সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক মাত্রা পায়। ব্যক্তিগত ক্ষোভ, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা একত্রিত হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃত্বেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।
বর্তমানে আহতদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো চিকিৎসা প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তবে মারধরের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সকলকে গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বড়াইগ্রামের খাকসা গ্রামে একটি পারিবারিক আর্থিক বিরোধ কীভাবে দ্রুত রাজনৈতিক উত্তেজনায় রূপ নিয়ে সহিংসতায় গড়াতে পারে—তারই একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল এই ঘটনা। পুলিশি তৎপরতায় আপাতত পরিস্থিতি শান্ত হলেও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ন্যায়সঙ্গত তদন্ত ও স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা হবে।
মন্তব্য করুন