স্টাফ রিপোর্টারঃ দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ সাইলো (শস্যভাণ্ডার) থেকে গম চুরি করে আসছে ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি পুরনো চক্র। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে বিদেশ থেকে আনা এই খাদ্যশস্য সাইলোর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহায়তায় চুরি হওয়ায় কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
দেশের তৃতীয় বৃহত্তম এই সাইলোর ভেতরের সূত্র ও নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ওজন মাপার মেশিন এবং সিসিটিভি ক্যামেরায় কারসাজি করে নিয়মিত এই চুরি করা হয়। কর্মকর্তারাই জড়িত থাকায় বিষয়টি গোপন থাকে।
তবে এবারের সর্বশেষ ২৭০ বস্তা গম চুরি আর ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হয়নি। গত ১৭ অক্টোবর চক্রের সদস্যরা নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত ২৭০ বস্তা গম নিয়ে নেয়, অথচ বস্তা গণনার মিটারে শুধু নিয়মমাফিক ৪ হাজার বস্তার হিসাবই দেখায়। চক্রের বাইরে থাকা কিছু কর্মী সন্দেহবশত ব্যাগিং মেশিনের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে অতিরিক্ত বস্তাগুলো দেখতে পান। এই ২৭০ বস্তা গমের ওজন সাড়ে ১৩ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।
সাইলো কর্তৃপক্ষের রেকর্ড অনুযায়ী, গত ২৪ সেপ্টেম্বর ‘এম.বি. আল মিরাজ’ নামের জাহাজে মোট ২০০ মেট্রিক টন বা ৪ হাজার বস্তা গম পাঠানোর চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৬৫ মেট্রিক টন বদরউদ্দিনের ‘এম/এস বাবা এনায়েতপুরী (রহ.) এন্টারপ্রাইজ’ এবং ৩৫ মেট্রিক টন তার আরেক প্রতিষ্ঠান ‘এম/এস দোয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে বরাদ্দ ছিল।
১৭ অক্টোবর সকাল সোয়া দশটা থেকে বিকাল পৌনে ছয়টার মধ্যে ব্যাগিং মেশিনের মাধ্যমে লোডিং করা হয়। হিসাব রাখার দায়িত্বে থাকা মনিটরিং কর্মকর্তারা গড়মিল দেখতে পেয়ে সুপারিনটেনডেন্ট ও ঠিকাদারকে জানান। সূত্রের দাবি, বদরউদ্দিন অতিরিক্ত গম নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও সরকারি গুদামে তা ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। বিষয়টি সুপারিনটেনডেন্ট মো. রিয়াজুল আলমের নজরে আনা হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
চুরির বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর সাইলোর ভেতর হুলস্থুল বেঁধে যায়। কিন্তু বরাবরের মতো এবারও চক্রের সদস্যরা চুরির দায় দুই অপারেটরের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছে।
গত ২৫ অক্টোবর সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আদনান আসিফ ব্যাগিং হাউসের দায়িত্বে থাকা মো. আব্দুল মালেক এবং নৌকা লোডিংয়ের দায়িত্বে থাকা মো. দুলালকে ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। সূত্রগুলোর মতে, আসল দোষীদের বাঁচাতেই এই নাটক।
সাইলোর সূত্রের অভিযোগ, সুপারিনটেনডেন্ট রিয়াজুল এবং দুই ঠিকাদার মো. সোহাগ ও বদরউদ্দিন এই চুরির মূল হোতা। সোহাগ ও বদরউদ্দিনের রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
২০১৮ সালেও একই কায়দায় ১ হাজার ১১ মেট্রিক টন গম সরকারি হিসাব থেকে গায়েব করার চেষ্টা হয়েছিল। তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আরিফুর রহমান ৩১ মে ২০১৮ তারিখের চিঠিতে তৎকালীন সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার উদ্যোগ নেন। কিন্তু পরে হপার স্কেলের ইনচার্জ আব্দুল মালেককে প্রধান অভিযুক্ত দেখানো হয়।
এরপর রিয়াজুলকে পোস্তগোলা মডার্ন ফ্লাওয়ার মিলে বদলি করা হয়। তিনি ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আবার নারায়ণগঞ্জ সাইলোতে সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে ফিরে আসেন। তার ফেরার পরেই পুরনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে জানান এক অপারেটর।
বদরউদ্দিন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে দাবি করেন তিনি সাইলোতে যাননি। অথচ সূত্র বলছে, শীতলক্ষ্যার তীরে সিদ্ধিরগঞ্জে সাইলোর পাশেই বাড়ি হওয়ায় তিনি নিয়মিত যাতায়াত করেন এবং ২০১৮ সালের পর থেকে সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত।
এ বিষয়ে ২৬ অক্টোবর রিয়াজুলকে ফোন করা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন বলে জানান, পরে আর কলব্যাক করেননি। তার পক্ষে তানভীর আদনান আসিফ জানান, রিয়াজুল প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলবেন না। তানভীর স্বীকার করেন, অতিরিক্ত বস্তার বিষয়টি তার জানা ছিল। সোহাগ ফোন বা মেসেজের জবাব দেননি।
খাদ্য অধিদপ্তরের মুভমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড সাইলো বিভাগের পরিচালক মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘২০১৮ সালে কী ঘটেছিল কিংবা নারায়ণগঞ্জ সাইলোতে কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে কি না, সে বিষয়েও আমার কিছু জানা নেই।’
মন্তব্য করুন